মলুটি মা মৌলিক্ষা মন্দির,মৌলিক্ষা মন্দির কোথায় অবস্থিত?,মৌলিক্ষা মন্দির-এর ইতিহাস?,মুলুটীতে মা মৌলিক্ষা মন্দির,মৌলিক্ষা মায়ের মন্দির,Malooti Temple History,মলুটি,তারা পিঠ মন্দির
আজ আপনাদের এমন একজনও পথে নিয়ে যাব যেখানে লোক কম মন্দির বেশি। নাটমন্দির আছে কিন্তু কেউ সেখানে আসেনা ৫০০ বছর আগে এখানে একসাথে ১০৮ টি শিব মন্দিরে ঘন্টা ও সংখ বাজিয়ে সন্ধ্যারতি হত। গম গম করে উঠতো চারিদিকে। কিন্তু আজ সে সব ইতিহাস। এই জনপদের চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে নিঃশব্দের হাহাকার মন্দিরের কঙ্কালগুলো সাক্ষী হয়ে রয়েছে প্রাচীন আভিজাত্যের। তার সাথে আমরা জানব মৌলিক্ষা মায়ের মন্দিরের অজানা তথ্য গুলি। কলকাতা থেকে খুব সহজেই একদিনের মধ্যেই ঘুরে ফেরা যায় এই জায়গায়। কিন্তু এখানে আসবেন কিভাবে? থাকবেনি বা কোথায়? আর এই জায়গার ইতিহাস বা কি? সবকিছু বলব। তবে এই ব্লগ টি পড়তে হবে শেষ পর্যন্ত। আশা করি নিরাশ হবেন না।

পশ্চিমবঙ্গের লাগোয়া রাজ্য ঝাড়খন্ড। আর সেই ঝাড়খণ্ডের তুমকা জেলায় অবস্থিত বহু প্রাচীন মৌলিক্ষা মায়ের মন্দিরে। এই মন্দিরে পুজো করে গেছেন স্বয়ং বামাক্ষ্যাপা। আর এই মন্দির সংলগ্ন গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য শিবমন্দির আজ আমাদের গন্তব্য স্থল তারাপীঠ থেকে খুবি কাছে মলুটি গ্রাম। এই গ্রাম ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সাক্ষী। তারাপিঠ থেকে মলুটির ডিসটেন্স প্রায় ১৯ কিলোমিটার। মলুটি পৌঁছাতে মোটামোটি সময় লাগবে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটে। মলুটি যাবার রাস্তার গ্রাম্য পরিবেশ টা অসাধারণ বললে কম বলা হবে। মলুটি যাবার রাস্তাটা অসাধারণ। মানে দুদিকে ধানের খেত। আর মাঝখান দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে পিচঢালা রাস্তা।
মৌলিক্ষা মায়ের মন্দির কোথায় অবস্থিত?
মৌলিক্ষা মায়ের মন্দির ঝাড়খন্ডের দুমকা জেলায়ে অবস্থিত। ১৮৫৭ সালের আসে পাশে বামাক্ষ্যাপা এখানে আসেন এবং সিদ্ধিলাভ করেন। চলো এবার আমরা জেনে নি মৌলিক্ষা মন্দির কোথায় অবস্থিত?
তারা পিঠ মন্দির একসময় ছিল নাটোরের রানীর এলাকায়। এরকম কথিত আছে যে একবার দ্বারকা নদী পেরিয়ে, তারাপীঠে পুজো দিতে এসেছিলেন ঝাড়খণ্ডের তৎকালীন রাজা। কিন্তু তারাপীঠের মন্দিরে রাজা কে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রাখেন নাটোরের রানীর কর্মচারীরা। শেষ পর্যন্ত ঝাড়খন্ডে ফিরে মলুটি গ্রামে ঘট প্রতিষ্ঠা করে মৌলিক্ষা দেবীর পুজো শুরু করেন রাজা।
এদিকে নাটোরের রানী কে স্বপ্নে দেখা দেন তারা মা। বলেন তার পুজো এখনো হয়নি। রানী তখন কর্মচারীদের কাছে পুজো না হওয়ার কারণ জানতে চান। তারা জানান ঝাড়খণ্ডের রাজা তারাপীঠের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে পুজো না দিয়েই ফিরে গিয়েছেন। রানীর নির্দেশে রাজাকে তারাপীঠে এনে পুজোর ব্যবস্থা করা হয়।

মৌলী অর্থাৎ মাথা আর ইখাৎস মানে দৃশ্যমান। মানে দৃশ্যমান মাথা। এই মন্দিরের ভেতরে মায়ের শরীরের মধ্যে ল্যাটেরাইট পাথরে (Laterite Stone) তৈরি শুধু মাথার অংশটাই (অর্থাৎ একটা মাথা) রয়েছে। তবে এই মূর্তিটি কখন এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সম্পর্কে কোনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। তবে বামাক্ষ্যাপা যে এখানে এসেছিলেন, এবং সেই মূর্তি পূজা করে তিনি সিদ্ধি লাভ করেছিলেন সেটা কিন্তু সত্যি।
মৌলিক্ষা মন্দির-এর ইতিহাস? Maluti Temple History
এখানে রাজপরিবারের সদস্যদের কাছে জানা গেছে যে, এই পুরো জায়গা টা বাজবসন্ত নামে খ্যাত। আর বাজবসন্ত রায় ছিলেন এই এলাকার রাজা। বসন্ত রায় ছিলেন বীরভূম জেলার ময়ূরেশ্বর এর কাছাকাছি কাটি গ্রামের এক দরিদ্র পিতৃহীন ব্রাহ্মণ সন্তান। সে লোকের গরু বাছুর চরিয়ে তার ও তার মায়ের দিন কেটে যেত কোনক্রমে। এদিকে গৌড়ের বাদশা হোসেন শাহ। উৎকল দেশ থেকে ফেরার পথে বিশ্রামের জন্য কোটি গ্রামে সামান্য দূরে ময়ূরাক্ষী ধারে তাবু ফেলেছেন।
হঠাৎ একদিন বেগম সাহিবার অতি প্রিয় এক পোষা পাখি কে সোনার শিকল কেটে পালায়। বাজপাখির নাকে হীরে বসানো সোনার নোলক। পায়ে সোনার শিকল। পাখির শোকে মৃতপ্রায় রানী কে সান্তনা দিতে সম্রাট ঘোষণা করলেন। যে ব্যক্তি পাখি ধরে এনে দিতে পারবে, তাকে সম্রাট যা চাইবে সে তাই দেবেন। বসন্তের পাতা ফাঁদে বাজপাখি আটকা পড়ে। বসন্ত সেই পাখিকে নিয়ে বাদশার দরবারে উপস্থিত হলেন। দরবারে উপস্থিত হতে সম্রাট যারপরনাই খুশি হয়ে হুকুম দিলেন। পরেরদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত বালক বসন্ত রায় ঘোড়ায় চড়ে যতটাই ঘুরতে পারবে সবটাই সে পাবে। নানকার জমিদারি হিসেবে এই ভাবেই বসন্ত রায় হলেন নানকার রাজ্যের রাজা। আর বাজ পাখি ধরার ফলে তার নাম হলো বাজবসন্ত।
গ্রামের ভেতর দিকে কিছুটা ঢুকে একটি জায়গা রয়েছে। এখানে বামাক্ষ্যাপা সাধনা করতেন। এই জায়গাটা খুবই পবিত্র জায়গা। এখানে একটি ছোট মন্দির আছে। সেই মন্দিরে বামদেবের ব্যবহৃত ত্রিশূল এবং বিভিন্ন পাথর শিলাখণ্ড যেগুলো বামদেব পূজা করতেন সেগুলো রাখা আছে।
এখানে আরেকটা কথা খ্যাত। সেটা হচ্ছে ত্রয়োদশীর দিন মানে দুর্গা দশমী একাদশী। তারাপীঠে তারা মায়ের মুখ যে দিকে অবস্থান করছেন। সেদিকে হয় এবং তারা মায়ের পুজোর আগে এখানে আগে বামদেবের পুজো হয় তার পর মৌলিক তারপর তারা মায়ের পূজা হয়।

বর্তমানে ১০৮ টি মন্দির আর নেই। রয়ে গেছে প্রায় ৭২ টি মন্দির। মন্দিরগুলোর অধিকাংশরই জীর্ণদশা। উচ্চতা প্রায় একই এবং সবগুলোতেই রয়েছে শিবের অধিষ্ঠান। এখানে যেকোনো মন্দিরে টেরাকোটার (Terracotta) কাজ করা হয়ে ছিলো। কিন্তু খুব দুঃখের বিষয় এই ভেতরের টেরাকোটার (Terracotta) কাজ গুলো চুরি হয়ে গেছে। এখন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (Archaeological Survey of India) এই জায়গাটা অধিগ্রহণ করেছে এবং এই টেরাকোটার (Terracotta) কাজ আবার এখানে বসানো হবে। কিন্তু পুরনো যে কাজটা কি আর ফিরে পাওয়া যাবে? ওপরে অংশে সংস্কৃত অথবা প্রাকৃত ভাষা মন্দিরের প্রতিষ্ঠা
মন্দিরগুলোর প্রবেশদ্বারের মাথার ওপরে অথবা দরজার উপরের খিলান অংশে সংস্কৃত অথবা প্রাকৃত ভাষায় মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপি উৎকীর্ণ রয়েছে। টেরাকোটার প্যানেল গুলোর বিষয়বস্তু মূলত রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের কাহিনী। মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের মাথার ওপর মূল প্যানেলে রাম রাবণের যুদ্ধ প্রাধান্য পেলেও রাজবাড়ী স্বর্ণমন্দিরে কেবল দেখা যায় মহিষাসুরমর্দিনী-র চিত্র।

এখানে আরও অনেক কিছু দেখার জায়গা আছে। এখানে আপনারা তিনটে মন্দিরের স্ট্রাকচার দেখতে পাবেন। ওই মন্দির গোলোর মধ্যে একটা মন্দিরের মতো দেখতে একটা মসজিদের মতো দেখতে আর একটা গির্জার মত দেখতে। এই মন্দির গুলো করা হয়েছিল মুসলমান কোন এক রাজার আক্রমণের হাত থেকে এই মন্দির গুলো কে বাঁচানোর জন্য। এখানে যে রাজা ছিলেন বাজবসন্ত উনার এই ধরনের মন্দির তৈরি করার কারণ অবশ্যই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হাত থেকে মন্দির গুলো কে রক্ষা করা ছিল।
কাশির আদি শঙ্করাচার্যের ঘরনার সাথে এই মৌলটি গ্রামের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বসন্ত রায় তখন রাজা হননি। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারের রাখাল বালক। কাশির সুমেরু মঠের মন্দির স্বামী নিগমানন্দ মহারাজ সেই সময় ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখেন মাঠে গরু ছেড়ে দিয়ে গাছের ছায়ায় ঘুমোচ্ছেন বসন্ত। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে রোদ পড়ায়। এক বিষধর সাপ ফনা তুলে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাকে তিনি অলৌকিক ঘটনা দেখতে পেয়ে রাখাল বালকের কাছে যেতেই লুকিয়ে পড়ল সেই বিষধর সাপ, এবং তিনি ঘুমন্ত কিশোরের মুখে রাজা হবার লক্ষণ প্রত্যক্ষ করলেন। স্বামী নিগমানন্দ মহারাজ বসন্তর ঘুম ভাঙিয়ে তার মায়ের কাছে উপস্থিত হলেন এবং বললেন যে শীঘ্রই বসন্ত রাজ্য লাভ করবে। স্বামী নিগমানন্দ মহারাজ বসন্তকে সিংহবাহিনী মন্দির দীক্ষা দিয়ে নিজের শিষ্য করে নিলেন।
মৌলিক্ষা মন্দির কি ভাবে যাব?
মৌলিক্ষা মন্দির-এর সব চেয়ে কাছের রেলওয়ে স্টেশন হলো রামপুরহাট। রামপুরহাট স্টেশনে নেমে গাড়ি বুক করে চলে আসতে পারেন এই মৌলটি গ্রামে। আর চাইলেই তারাপীঠ ঘুরতে এসে চলে আসা যায়।
থাকতে হলে কোথায় থাকবে?
সেই সংক্রান্ত ফোন নাম্বার নিচে দেওয়া আছে।
- ডাকবাংলো (দুমকা, মলুটি ) – 9593113027, 9609534281
বন্ধুরা যতটুকু আমি জেনেছি তত টুকুই সংক্ষিপ্তাকারে জানানোর চেষ্টা করলাম। আপনাদের কেমন লাগলো কমেন্ট বাক্স-এ জানাতে ভুলবেন না।
Team KDD